Thursday, October 19, 2017

কুসুমিত পল্লব

কুসুম বাপের বাড়ি এসেছে অনেক দিন পরে. ভায়ের বিয়ে আছে. তাই একটু আগে থেকেই এসেছে| ঘর দর গোছানো, বিয়ে বাড়ির আরো নানান কাজে তাকে লাগতে হবে| মায়ের বয়েস হয়ে গেছে, আর পারেন উনি. তাছাড়া মা কোনোদিনই খুব একটা পরিশ্রমের কাজ করতে পারতেন না, ধীরে ধীরে কাজ করেন, কারণ তাকে কোনোদিন সংসারের তেমন কাজ করতে হয়নি. শাশুড়ি সামলে দিয়েছেন. কুসুমের বিয়ের পর কুসুম বেশ গিন্নি বান্নি হয়েছে.
দোতালার বারান্দা, বোরখার, ঠাকুর ঘর সাবি এক এক করে গোছাতে হবে. প্রথমেই বারান্দা দিয়ে শুরু, কারণ ওখানেই কুসুমের বই এর আলমারি আছে. ওটার এখন তেমন দরকার নেই , নিচের ঘরে নামিয়ে দেওয়া হবে তার আগে কুসুম কে দেখে নিতে হবে ওতে কোনো দরকারি জিনিস আছে কিনা. সকাল থেকে আলমারি খানা খুলে বসলো. কত স্মৃতি যে আছে ওই আলমারি ঘিরে. বন্ধুদের দেওয়া গ্রিটিংস কার্ড, বাবার ,মায়ের দেওয়া চিঠি. পুরোনো নোটস, question পেপার, গুচ্ছের বই. কলেজ স্ট্রিট ওগুলো বিক্রি করে দেওয়াই ভালো. ঘাঁটা ঘাঁটি করতে করতে বেশ কয়েকটা পুরোনো ডায়েরি তার হাতে এলো. ডেইরি লেখার অভ্যেস ছিল কুসুমের, এখন সেসব কোথায় হারিয়ে গেছে সংসারের চাপে .
ডায়েরি এর কয়েকটা পাতা পরে হাত ভম্ব হয়ে গেলো সে. দু তিন বছরের ডায়েরি  মেলালে যে গল্প দাঁড়ায় তা বেশ আশ্চর্য্য জানাক.

১৯৯৮ সালের পুজোর  সময়, বাড়ি এসেছিলো সে. পুজোর ছুটি শেষ হলে, হোস্টেল ফিরে গিয়েছিলো, ফিরে যাওয়ার পর দিদির একটা ফোন তৎক্ষণাৎ বাড়িতে আস্তে হয় তাকে. এসে দেখে, মা এর মেন্টাল স্টেবিলিটি নেই. উল্টো পাল্টা বলছে, আর অনবরত বাবাকে প্রণাম করছে, আর জানালার রড ধরে শুধুই বলছে যে কিছুতেই পাগলা গারদে যাবে না. কে পাঠাচ্ছে মাকে, পাগলা গারদে ? অনেক বার মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলো , কিন্তু স্বাভাবিকতা হারিয়েছেন মা. খুব কষ্ট পেলো কুসুম, বারান্দার গ্রিল ধরে হাউ হাউ করে কাঁদলো, কিন্তু কারোর তো কিছু করার নেই এখানে. বাবা বার বার বলছেন "সব শেষ হয়ে গেলো,সব শেষ হয়ে গেলো". যখন বাবা এতটা ভেঙে পড়েছেন, তখন কুসুম শক্ত করলো নিজের মন. সে শুনেছে এরকম রোগের অনেক চিকিৎসা হয় আজকাল. দিদির সাহায্য নিয়ে কিছু ডাক্তার এড্রেস নিয়ে , মাকে নিয়ে বাঁকুড়া সদর এর এক হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়. কিছুদিন পরে মা একটু সুস্থ হলে , প্রায় ২টি week পরে হোস্টেল ফেরে সে, পরীক্ষা সামনে, কলেজ অনেক পড়া এগিয়ে গেছে, কিন্তু পড়াশুনোয় মন বাসাতে পারলো না সে..তাতে রেজাল্ট বেশ খারাপ হলো. আমাদের দেশের পড়াশুনোয় কেউ একবার সিস্টেম ফেল করে গেলে, তার আর কিছু করার থাকেনা.

তার পর ১৯৯৯ এর মার্চের কয়েকটা পাতা থেকে যে চিত্র ফুটে উঠলো..সেটা একটু বলছি, কিন্তু তার আগে..কুসুমের পরিবার তা কেমন, সেটা একটু জানিয়ে দিই.
বাঁকুড়ার বেশ পুরোনো বনেদি বাড়ি ওরা. বহু বছর আগে ওরা বেশ বোরো জমিদার ছিল. ওর দাদুর সাত ভাই, সবাই এখন আলাদাই থাকে,কিন্তু একটাই দালান বাড়িকে ভাগ করে নিয়ে..নিজেরা যে যার মতো এক্সটেনশন করেছে. ছোট দাদুরা আর  সেজো দাদুর কয়েকজন ছেলে মেয়ে কলকাতায় থাকেন, বাকি সব ওই বাড়িতেই থাকেন. অনেক বোরো বাড়ি, লোকালয়ে ওরা বেশ বিখ্যাত বাড়ি. কুসুমের বাবার দু ভাই. কুসুমের দু বোন এক ভাই, কান্তা,কুসুম বাবানকাকুর দুই মেয়ে, তুলি জুলি, ছোট মেয়ে তা প্রসব করতে গিয়ে কাকিমা মারা যান. তুলি এর সাথে কুসুমের খুব ভাব, আবার ঝগড়াও. তুলি কুসুমের থেকে মাত্র দু বাছারের ছোট.
ঠাকুমার অমত থাকায় ,কাকুকে দ্বিতীয় বার বিবাহ দেওয়া হয়নি, তবে শোনা যায় , ছোট মেয়ে জুলির baby  sitter কেই নাকি তিনি বিয়ে করেছিলেন, যাকে ultimately বাড়িতে না ঢুকতে দেওয়ায় নাকি তার এই ফ্যামিলি এর প্রতি বেজায় রোষ বেড়ে যায়.

মার্চ মাসে ফাইনাল পরীক্ষার পরে বাড়ি এসেছে কুসুম. তখন গরম পড়েনি সেরকম তাই ছাদের ঘরে বেশ ভালোই আড্ডা বসেছে. সেনও দাদুর ছোট ছেলে,শান্তু কাকু বোম্বে তে থাকে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে , সেও বাড়িতে এসেছে, দিদি,কুসুম ,শান্তু কাকুতে বেশ আড্ডা বসলো. শান্তু কাকু ভালো হাত দেখতে পারে, এমনটাই সবাই বলে.

No comments:

Post a Comment