Sunday, August 23, 2026

বিদ্যাসাগর কলেজ এর দিন গুলি -১

মানুষের জীবনের পথচলা তাকে কতটা বদলে দেয়, কতটা আলাদা করে তোলে—তা হয়তো পথ চলতে চলতেই বোঝা যায়। আজ জীবনের অপরাহ্নে এসে যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়, সময় যেন নিঃশব্দে কতগুলো জীবন পার করে দিয়েছে আমার ভেতর দিয়ে। সেই জীবনের কিছু মুহূর্ত আজও রয়ে গেছে—কখনো খুব স্পষ্ট, কখনো কুয়াশার মতো আবছা। আর সেইসব স্মৃতিরাই আজকাল অবসরের সঙ্গী। বহুদিন হলো ব্লগে লেখার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অথচ আজ হঠাৎ মনে হলো, লেখার জন্য সবসময় নতুন কোনো ঘটনা লাগে না; কখনো কখনো পুরোনো স্মৃতির দরজায় আলতো করে কড়া নাড়লেই গল্পেরা নিজেরাই বেরিয়ে আসে। তাই আজ তেমনই কিছু কথা লিখে রাখছি—নিজের জন্য, আর হয়তো আপনাদের সঙ্গেও একটু ভাগ করে নেওয়ার জন্য। তখন আমি বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্রী। তমলুক থেকে কলকাতায় পড়তে আসা—যদিও তমলুককে ঠিক গ্রাম বলা যায় না, তবু কলকাতা বা তার আশেপাশের অঞ্চলের তুলনায় আমার কাছে এই শহর ছিল একেবারেই নতুন এক জগৎ। প্রথমবার গার্লস স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কো-এড কলেজ। প্রথমবার বাড়ির বাইরে থাকা। যেহেতু তখন বিদ্যাসাগর কলেজে কোনো হোস্টেল ছিল না, তাই পিজি-তে থাকা—সব মিলিয়ে তখনকার আমার কাছে ব্যাপারটা ছিল বেশ বড় এক চ্যালেঞ্জ। আমি তখন ভীষণ লাজুক, কিছুটা অন্তর্মুখীও। ভালো মেয়ের মতো খুব বেশি ক্লাস বাঙ্ক করতাম না। ক্লাস শেষ হলেই সোজা পিজি-তে ফিরে আসতাম। নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন শহর—সবকিছুর সঙ্গেই যেন একটু একটু করে পরিচয় তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু সেই আমিই যে একদিন কলকাতার রাস্তায় এতটা হাঁটব, এত গল্প করব, এত কিছু দেখব—তখন কি আর জানতাম! আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কতদিন যে হেঁটে হেঁটে ঠনঠনে কালীবাড়ি থেকে শ্যামবাজার, কখনো বা বাগবাজার চলে যেতাম! এখন ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে—কী অনায়াসে এতটা পথ হেঁটে ফেলতাম! হাতে কোনো মোবাইল নেই, কোথাও পৌঁছনোর তাড়া নেই, সময়ের হিসেব নেই। পথে টোপা কুল কিনে খেতে খেতে, আর দেদার গল্প করতে করতে কখন যে পথ শেষ হয়ে যেত, টেরই পেতাম না। আজকের দিনে হয়তো সেই হাঁটাটাই সবচেয়ে বড় বিলাসিতা। একবার সেই হাঁটার পথেই এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও মনে পড়লে হাসি পায়, আবার একটু অবাকও লাগে। হঠাৎ দেখি, এক মহিলা একটা ঝুড়ি নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই ঝুড়ি থেকে একটা সাপ বের করে ফেললেন! আমি তো ভয়ে একেবারে দিশেহারা। পাশের একটা দোকানে প্রায় উঠে পড়লাম। আর আমার বন্ধুটি—সে বোধহয় আমার থেকেও অনেক বেশি সাহসী—মহিলাটিকে দশ কি কুড়ি টাকা দিয়েছিল। আজ আর ঠিক মনে নেই। টাকা পেয়ে মহিলা আবার সাপটাকে ঝুড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে, ঝুড়ির মুখ চাপা দিয়ে চলে গেলেন। ভিক্ষে নয়—সাপ দেখিয়ে ভয় দেখিয়ে পয়সা নেওয়া! কলকাতা তখন আমার কাছে শুধু একটা শহর ছিল না; প্রতিদিনই যেন নতুন নতুন দৃশ্যের বই খুলে দিত। আর ছিল খাবারের গল্প। তখন রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাওয়া আমাদের কাছে খুব সাধারণ ব্যাপার ছিল না। হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে, অনেক হিসেব-নিকেশ করে, কখনো সখনো গোলবাড়ির কষা মাংস আর রুমালি রুটি খাওয়া হতো। সেই খাওয়ার আনন্দ আজকের কত দামি রেস্তোরাঁর খাবারের থেকেও যেন বেশি ছিল। কারণ তখন ছিল অপেক্ষা। ছিল সামান্য পাওয়ার মধ্যে অনেকখানি আনন্দ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা। আর ছিল গল্প। তখন তো মোবাইলের যুগও ছিল না। ছবি তুলে সঙ্গে সঙ্গে কাউকে পাঠিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না, কোথায় আছি জানিয়ে দেওয়ার তাড়াও ছিল না। মুহূর্তগুলো তাই বোধহয় আরও গভীরভাবে মনে জমা হতো। যা দেখতাম, যা শুনতাম, যা অনুভব করতাম—সবই যেন মনের অ্যালবামে নিজে থেকেই ছবি হয়ে থেকে যেত। আরেকটি কথা খুব মনে পড়ে। প্রথমবার বন্ধুদের সঙ্গে কফি হাউস গিয়েছিলাম। সে-ও এক অভিজ্ঞতা! আর প্রথম দিনেই আমি একটা কাপ ভেঙে ফেলেছিলাম। কী লজ্জা! মনে আছে, সেদিন কী গুনে গুনে কথা বলেছিলাম। মনে হচ্ছিল, চারপাশের সবাই বুঝি শুধু আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আজ ভাবলে সেই লাজুক মেয়েটার জন্য মায়া হয়। কারণ বিদ্যাসাগর কলেজের সেই মেয়েটি আর আজকের আমি—এক মানুষ হয়েও যেন কত আলাদা! তখন যে মেয়ে নতুন মানুষের সামনে কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেবে নিত কী বলবে, সেই মেয়েই আজ এত স্মৃতি নিয়ে বসে আছে। কত মানুষ এসেছে জীবনে, কত পথ পেরিয়েছি, কত শহর দেখেছি, কত অভিজ্ঞতা জমেছে—তার হিসেব নেই। হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর রহস্য। মানুষ একই থাকে, অথচ তার ভেতরের মানুষটি প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যায়।

1 comment: